মঙ্গলবার     ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯    ৭ই ফাল্গুন, ১৪২৫      রাত ৯:৩০

পর্যটন দ্রুত বিকাশমান শিল্প। বিশ্বের কয়েকটি দেশ একমাত্র পর্যটনকে অবলম্বন করেই সমৃদ্ধির শিখরে আরোহন করছে। বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিতে পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন সাধন করাই হলো পর্যটন শিল্পের মূল বিষয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনা আরো উজ্জ্বল। ভিজিট বাংলাদেশ স্লোগানে শুরু হলো পর্যটন বর্ষ-২০১৬। স্বাগত জানাচ্ছে বাংলাদেশ ও বিশ্বের ভ্রমণপিপাসুদের। পৃথিবীর অনেক দেশের অর্থনীতির নাড়ির স্পন্দনের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছে পর্যটনকে কেন্দ্র করে। মালয়েশিয়ায় পর্যটনখাতের বার্ষিক অবদান প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার।

থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরও তাদের পর্যটন শিল্পকে আকর্ষণীয়ভাবে সাজিয়েছে। নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের একটি প্রধান শিল্প হিসেবে পর্যটন দ্রুত বিকশিত হয়েছে। নেপালের মোট জাতীয় আয়ের ৪০ শতাংশ আসে পর্যটন শিল্প থেকে। ভারতে আছে প্রচুর ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান। বাংলাদেশেও এ শিল্পের সম্ভাবনা অফুরন্ত। পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে বাংলাদেশও কাজে লাগাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঠিকমতো ও পরিকল্পিত ভাবে করতে পারলে সুইজারল্যান্ড, পাতায়া, ব্যাংককের মতো ট্যুরিজম এখানেও গড়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অতুলনীয়। বাংলাদেশের মতো ষড়ঋতুর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আমাদের আছে নদ-নদী, সবুজ-শ্যামল মাঠ, ফসলের ক্ষেত, ছায়াঢাকা গ্রাম, শান বাঁধানো পুকুর। গ্রামবাংলার মানুষের সরল জীবন বিশ্বের যেকোনো মানুষের হৃদয় আকৃষ্ট করে। মনোরম পাহাড়, সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন, টেকনাফ তো আছেই। আরো আছে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ময়নামতি বিহার, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মনোমুগ্ধকর পাহাড়ের চা বাগান আর আদিবাসীদের বিচিত্র জীবনধারা।

আছে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, মাধবকুণ্ডের ঝর্ণাধারা, ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প, রেশম শিল্প, খাদি শিল্প, জামদানি, টাঙ্গাইলের তাঁত, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগান, বাংলার বিচিত্র পেশা, ঐতিহ্যবাহী সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, স্বাধীনতা ও ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস-ভাস্কর্য ও স্থাপনা, চিরসুন্দর গ্রামীণ জনপদ, হাটবাজার, মেলা-কৃষ্টি-কালচার, কৃষক-কৃষাণীর সংগ্রামী জীবন, ঋতুবরণ ঐতিহ্য, বাংলা নববর্ষের উৎসব এসবকিছুই পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

আমাদের হাকালুকি হাওর এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি। টাঙ্গুয়ার হাওর, শনির হাওর, ডিঙ্গাপুতা হাওরসহ দিগন্ত বিস্তৃত হাওরের সমাহার। বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থানের মধ্যে আরো আছে- তিন পার্বত্য জেলা, নিঝুম দ্বীপ, হাতিয়া, সোনাদিয়া, পতেঙ্গা, মৌলভীবাজার, মহেশখালী, চট্টগ্রামের ফয়স লেক, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ ইতিহাস-ঐতিহ্য সমৃদ্ধ অনেক স্থান, পাহাড়পুর বিহার, শালবন বিহার, মহাস্থানগড়, রানী ভবানীর কীর্তি, বিভিন্ন মসজিদ, মন্দির, গীর্জা। আরো আছে ময়নামতি, রামসাগর, সোনারগাঁও, নাটোর, রাজবাড়ি, দীঘাপাতিয়া জমিদার বাড়ি, তাজহাট জমিদার বাড়ি, কক্সবাজারের বৌদ্ধ মন্দির, ঢাকার লালবাগ দুর্গ, আহসান মঞ্জিল, গৌড় লক্ষণাবতী শহর, বাগেরহাটের অযোধ্যা মঠ ইত্যাদি।

এসব স্থান ভ্রমণপিপাসু বিশ্ববাসীর কাছে আকর্ষণীয় এবং তাদের অবকাশ কাটাবার উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার প্রতিটিই স্বরূপে অপরূপ আকর্ষণীয়। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমি সুন্দরবন; সিলেটের দীর্ঘতম চা বাগান; পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই হ্রদ; জাফলং; মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত। নওগাঁ, নাটোর, দিনাজপুর, কুমিল্লা, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, শেরপুরের প্রত্নসম্পদ।

ট্যুরিস্ট অথরিটির তথ্যমতে, ১৯৫০ সালে বিশ্বে পর্যটকের সংখ্যা ছিলো মাত্র ২ কোটি ৫০ লাখ। প্রতিবছর এ খাতে বিশ্বে প্রায় ৬৩০ বিলিয়ন ডলার ব্যবসা হয়। সমীক্ষা থেকে জানা যায়, পর্যটন শিল্প একক শিল্প খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে বিশ্বের মোট জিডিপিতে অবদান রাখছে শতকরা ৯ ভাগ। বিশ্বের মোট চাকরি বা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখছে শতকরা ৮ ভাগ। বিশ্ববাণিজ্যের ক্ষেত্রে অবদান রাখছে শতকরা ৬ ভাগ- যার পরিমাণ ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার।

তথ্যে-উপাত্তে দেখা গেছে, বিশ্বে প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত। পরোক্ষভাবে এই খাতে প্রায় ৮০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। জানা গেছে, ভ্রমণপিপাসু পর্যটকেরা প্রতিবছর থাকা, খাওয়া, ভ্রমণ, দর্শন এবং কেনাকাটা বাবদ খরচ করেন প্রায় ৫০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। আরো জানা গেছে, বিশ্বের প্রায় ৮৩ ভাগ দেশের সবচেয়ে জাতীয় আয় আহরণকারী প্রথম পাঁচটি খাতের মধ্যে পর্যটন একটি বিশেষ খাত। বিশ্বের প্রতি ১১ জন কর্মজীবীর মধ্যে ১ জন সরাসরি পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত।

২০০৬ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে বাংলাদেশের সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল হওয়ায় পশ্চিমা ভ্রমণবিলাসীদের কাছে ইন্দোনেশিয়ার অবকাশ কেন্দ্র বালি অথবা থাইল্যান্ডের চমৎকার বিকল্প হতে পারে বাংলাদেশ। পর্যটন শিল্প সম্পর্কে অভিজ্ঞদের মতে, আধুনিক ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে কক্সবাজারকে গড়ে তোলা হলে পর্যটকের সংখ্যা বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা অন্তত দশগুণ বাড়বে। ফলে রাজস্ব আয় দাঁড়াবে ন্যূনতম ২০ হাজার কোটি টাকা।

পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে সরকারেরও আছে নতুন পরিকল্পনা। সরকার ইতোমধ্যে সারাদেশে ৮ হাজার পর্যটন স্পট নির্ধারণ করেছে। সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা টেকনাফ নিয়ে নতুন করে ভাবছে সরকার। টেকনাফকে নিয়ে নতুন যে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে এর নামকরণ করা হয়েছে ‘প্রিপারেশন অব ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান অব কক্সবাজার টাউন অ্যান্ড সী বীচ আপ টু টেকনাফ’ শীর্ষক প্রকল্প। বাংলাদেশের এই পর্যটন কেন্দ্র দেশের রাজধানী থেকে অনেক দূরে হওয়ায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত রেল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। রেলে দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে ভালো যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হলে কম খরচ ও সময় সাশ্রয় হবে। পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সাথে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়ালে পাল্টে যাবে অর্থনৈতিক চেহারা।

পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে প্রয়োজন-
* দেশের আনাচে-কানাচে অরক্ষিত ঐতিহ্যমণ্ডিত দর্শনীয় স্থানগুলোকে সুরক্ষিত করার উদ্যোগ নিলে স্থানীয়ভাবে বহু লোকের নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
* শুধু বিদেশি পর্যটকদের নির্ভরতায় না থেকে ‘দেশকে চিনুন, দেশকে জানুন’, ‘ঘুরে দেখুন বাংলাদেশ-ভালোবাসুন বাংলাদেশ’- এরকম দেশাত্মবোধক স্লোগানে দেশের মানুষকে দেশ দেখানোর লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচারণা চালানো দরকার।
* মালয়েশিয়ার আদলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বছরে একবার শিক্ষা সফরের আয়োজন বাধ্যতামূলক করা দরকার। শিক্ষা সফর বাধ্যতামূলক করা হলে এ প্রজন্মের সন্তানরা দেশকে চিনবে, জানবে, ভালোবাসবে। পাশাপাশি আয় হবে হাজার টাকা।
* পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। ট্যুরিস্ট পুলিশ ব্যবস্থা কার্যকর করা দরকার।
* নৌ ভ্রমণ হতে পারে পর্যটনের আরেক পদক্ষেপ। নতুন প্রজন্ম দেশের নদীগুলোকে চিনবে এবং ইতিহাস জানবে।
* বর্ষায় এবং শুকনো মৌসুমে দুই বিপরীত রূপের হাওর দর্শন হতে পারে পর্যটনের নতুন আকর্ষণ।
* শহরে জন্ম ও শহরে বেড়ে ওঠা প্রজন্মকে গ্রামের সাথে পরিচিত করে তোলাটাও হতে পারে পর্যটনের নতুন ক্ষেত্র। কৃষি, কৃষক এবং গ্রামের মানুষের সরল জীবন দর্শন হতে পারে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের উৎস।
* পর্যটন সমৃদ্ধ অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পর্যটকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা, পর্যটন এলাকায় পর্যটন পুলিশ স্টেশন স্থাপন, পর্যটকদের জন্য বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং ওয়েবসাইটে প্রচারণা বা ক্যাম্পেইন জরুরি।

Comments

No comments found!

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Login Registration
Remember me
Lost your Password?
Login Registration
Registration confirmation will be emailed to you.
Password Reset Registration
Login